মেহেদী হাসান তানিম : সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে যুক্ত হলো আরও একটি নতুন অধ্যায়। প্রতিষ্ঠানটির দুই কৃতি শিক্ষার্থী অরূপ দে ও শ্রীবাস দাস ভারত সরকারের স্বনামধন্য ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (ICCR) এর পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি লাভ করেছেন। এই উল্লেখযোগ্য অর্জন কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এমসি কলেজের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক দারুণ প্রতিফলন।

এমসি কলেজের বাংলা বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শ্রীবাস দাস স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভারতের হায়দ্রাবাদে অবস্থিত ইংলিশ অ্যান্ড ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস ইউনিভার্সিটিতে কম্পারেটিভ লিটারেচার (Comparative Literature) ভর্তি হতে যাচ্ছেন। শিক্ষাজীবনে তাঁর এই অসাধারণ কৃতিত্ব সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। শ্রীবাস কেবল একজন মেধাবী শিক্ষার্থীই নন, কলেজের সহশিক্ষা কার্যক্রমেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। তিনি বর্তমানে এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটির সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং মোহনা সাংস্কৃতিক সংগঠনের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও অবদান রাখছেন। তাঁর সর্বশেষ অর্জন হলো বাংলা বিভাগে সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘বারী ট্রাস্ট স্কলারশিপ ২০২৫’, যা তাঁর শিক্ষাগত শ্রেষ্ঠত্বের আরও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শ্রীবাসের এই অর্জন অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জন্য এক অসাধারণ অনুপ্রেরণা, যা প্রমাণ করে যে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় সাফল্যের দুয়ার খুলে দেয়।

এমসি কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৭-১৮ সেশনের প্রাক্তন শিক্ষার্থী অরূপ দে পারফর্মিং আর্টস বিভাগে তবলায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন, বোলপুরে যাচ্ছেন। শান্তিনিকেতনের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে শিল্পকলার ওপর উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ নিঃসন্দেহে অরূপের জন্য এক বিশাল অর্জন। এটি কেবল শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য নয়, বরং শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ এবং প্রতিভার স্বীকৃতি। অরূপের এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, অ্যাকাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিল্পকলার জগতেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম।

ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (ICCR) প্রদত্ত এই বৃত্তি একটি পূর্ণাঙ্গ স্কলারশিপ, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথে সকল আর্থিক বাধা দূর করা হয়েছে। এই বৃত্তির আওতায় শ্রীবাস ও অরূপের সম্পূর্ণ ভর্তি ফি, টিউশন ফি, এবং আবাসন খরচ সহ অন্যান্য যাবতীয় ব্যয়ভার ভারত সরকার বহন করবে। এছাড়াও, ব্যক্তিগত খরচ নির্বাহের জন্য তাঁরা মাসিক বৃত্তি পাবেন। স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি মাসে ১৮ হাজার ভারতীয় রুপি এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি মাসে ২০ হাজার ভারতীয় রুপি প্রদান করা হবে। এই আর্থিক সহায়তা শিক্ষার্থীদেরকে নির্বিঘ্নে তাঁদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে এবং নিজেদের মেধা বিকাশে পূর্ণ মনোযোগ দিতে সাহায্য করবে।

একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং অনুপ্রেরণার উৎস
শ্রীবাস দাস এবং অরূপ দে-এর এই সাফল্য এমসি কলেজ এবং বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট গর্বের বিষয়। এটি কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণের সহায়ক হবে না, বরং দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। আশা করা যায়, এই দুই শিক্ষার্থী তাঁদের পড়াশোনা শেষে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। তাঁদের এই অর্জন এমসি কলেজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিনের সুনাম এবং ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি, যা প্রমাণ করে যে এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিভাবান ও দেশপ্রেমিক শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *